Breaking News
Home / সম্পাদকীয়/উপসম্পাদকীয় / কোভিড-১৯ ও স্বাস্থ্যবিধি | ড. মো. হারিছ উদ্দিন

কোভিড-১৯ ও স্বাস্থ্যবিধি | ড. মো. হারিছ উদ্দিন

নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর পৃথিবীর সর্বত্র কিছু শব্দ বা পরিভাষা (Jargon)যেমন স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দুরত্ব বা সোশ্যাল ডিসটেন্সিং, ফিজিক্যাল ডিসটেন্সিং, কোয়ারেনটিন, আইসোলেশন, লকডাউন ইত্যাদি বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।যেহেতু করোনাভাইরাস প্রতিকার বা প্রতিরোধের কোনো ভ্যাকসিন বা ঔষধ আবিষ্কৃত হয়নি তাই সংক্রমন থেকে রক্ষা পেতে পরিপূর্ণভাবে স্বাস্থ্যবিধি, সোশ্যাল ডিসটেন্সিং, ফিজিক্যাল ডিসটেন্সিং মেনে চলা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোয়ারেনটিন এবং আইসোলেশনে রাখা, আক্রান্ত এলাকাকে অন্যান্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে লকডাউন করে রাখা এগুলোই হলো করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের কার্যকর পদ্ধতি।অতিমারি কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে ‘প্রতিকার নয় প্রতিরোধই উত্তম’ এই প্রবাদ বাক্যটিই বেশি কার্যকর বলে এখনও পর্যন্ত মনে করা হচ্ছে।করোনাভাইরাস সংক্রামন থেকে রক্ষা পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, বিশেষজ্ঞ, জীব-অনুজীব বিজ্ঞানী সকলেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর।ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন সাবান পানি দিয়ে বার বার হাত ধোয়া, সেনিটাজার দিয়ে হাত জীবানু মুক্তকরা, মুখে মাস্ক ব্যবহার করা, হাঁচি-কাশির সময় মূখে রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা, যেখানে সেখানে থুথু-কফ না ফেলা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, ব্যক্তিগত সুরক্ষা বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধের মুখ্যম অস্ত্র হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ বিবেচনা করছেন।বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু মুখে মাস্ক ব্যবহার করে এবং বার বার সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে প্রায় ৮০% পর্যন্ত করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা কর সম্ভব।কোভিড-১৯ আবির্ভাবের ছয়মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও সংক্রামন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা এবং কোনো কার্যকর ঔষধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলার কোনো সহজ ও জাদুকরী সমাধান নেই এবং হয়তো কোনো দিন পাওয়া যাবেনা।পৃথিবী আর কখনও পূর্বের অবস্থায় ফিরবেনা।স্বাভাবিকতায় ফেরার পথ হবে দীর্ঘ। জনগণ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে আমাদের পরিস্কার বার্তা হলো সকলেই পরিপূর্ণভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।মুখে মাস্ক পরাটা বিশ্বজুড়ে সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠা উচিত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়ুসুস গত ৩ আগস্ট জেনেভায় এক ভার্চূয়াল সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেছেন কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন সফল হওয়ার আশা থাকলেও চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি; কার্যকর ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।যদিও বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কার্যকর বলেই প্রমানিত হয়েছে।একটি কার্যকর টিকা মানুষকে সংক্রমণ থেকে রক্ষার ব্যপারে সহায়তা করতে পারে।করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণায় বেশকিছু অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।একটি কার্যকর টিকা আসার পূর্ব পর্যন্ত পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেলে চলাই হবে করোনাভাইরাসের সংক্রমন থেকে সুরক্ষার প্রধানতম প্রতিরোধ বর্ম।সেজন্যই করোনাকালের এই সময়ে পৃথিবীর সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।‘স্বাস্থ্যবিধি’ শব্দটি বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত হলেও এটি নতুন কোনো ধারণা নয়।বাংলা ‘স্বাস্থ্যবিধি’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Hygiene যা গৃহীত হয়েছে ল্যাটিন ‘হিউজিনে’ শব্দ থেকে যার অর্থ হলো স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা কৌশল।ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার চর্চা করা ও কিছু স্বাস্থ্যগত নিয়মনীতি প্রতিপালনের মাধ্যমে সুস্থ্যতা, শুদ্ধতা, শুচিতা, সুশৃংখলা ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখাকেই স্বাস্থ্যবিধি বলা হয়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, যেসব নিয়মাবলী অনুশীলনের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং রোগজীবানু ও সংক্রামন থেকে মুক্ত থাকা যায় সেগুলোকেই স্বাস্থ্যবিধি বলে।ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বলতে দৈহিক ও শারীরিক পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাকে বুঝায়।করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে এবং বহুবার জিনগত পরিবর্তন ও মিউটেশনের ফলে ভাইরাসের চরিত্রগত সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট পরিমানে জানতে পারেনি; যদিও বহু গবেষণা হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বললেও একটি বিষয়ে সকলেই একমত আর তা হলো করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কার্যকারিতা।পৃথিবীর সমূদয় বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী, ভাইরোলজিস্ট এবং চিকিৎসাবিদগণ করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে সকলকে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর গুরুত্বারোপ করছেন।শুধু করোনা মোকাবিলাই নয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে সবধরনের রোগবালাই, ছোঁয়াছে জীবানু, সংক্রামক ভাইরাস এবং কঠিন ও জটিল অসুখ-বিসুখ থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।তাছাড়া স্বস্থ্যাবিধি মেনে চলা ও এর কতিপয় অনুশীলনকে সমাজে একটি ভালো গুণ ও অভ্যাস হিসেবেও দেখা হয়।স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দেহ ও শরীর স্বাস্থ্য যেমন সুস্থ, সবল ও সুন্দর থাকে তেমনি মন, মগজ, মস্তিস্ক ও মানসিকতা হয় সুস্থির, সাবলিল, পরিশুদ্ধ, পরিপাটি, পরিশিলীত, পরিমার্জিত ও পরিস্ফুটিত।একটি সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে যেমন সু নাগরিক দরকার তেমনি একটি মননশীল, সংবেদনশীল, সুসভ্য ও সুদক্ষ জাতি গঠনে দরকার সুশৃংখল, সুগঠিত, সুঠাম, সক্ষম, সুদৃঢ়, সৌষ্ঠব, সবল ও সুস্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠী; আর এটি সম্ভব সর্বত্র সকলের মধ্যে নিয়ম-শৃংখলা, সচেতনতা, সতস্ফুর্ত ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উদ্ভুদ্ধকরণের মাধ্যমে।স্বাস্থ্যবিধি একটি ব্যাপক বিষয় এর মধ্যে যেমন একক ও ব্যক্তিগত বিষয় রয়েছে তেমনি রয়েছে সামাজিক, সম্মিলিত ও সামষ্টিক বিষয়।স্বাস্থ্যবিধিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখা যায় যেমন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি, পারিবারিক স্বাস্থ্যবিধি, গৃহাভ্যন্তরে স্বাস্থ্যবিধি, নবজাতকের স্বাস্থ্যবিধি, বয়স্কদের স্বাস্থ্যবিধি, ধোয়া-মোছার স্বাস্থ্যবিধি, বহিঃস্থ স্বাস্থ্যবিধি, অফিস বা কর্মস্থলে স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি, হাসপাতালে স্বাস্থ্যবিধি, আক্রান্ত বা অসুস্থ্য রোগীর স্বাস্থ্যবিধি, হাট-বাজারে স্বাস্থ্যবিধি, কেনাকাটায় স্বাস্থ্যবিধি, খাবারে স্বাস্থ্যবিধি, রান্নঘরে স্বাস্থ্যবিধি, বাথরুম ও টয়লেটের স্বাস্থ্যবিধি, ভ্রমনে স্বাস্থ্যবিধি, পরিবহণে স্বাস্থ্যবিধি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি, কলে-কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি, জনসমাগমে স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি, রাষ্ট্রীয় সেবাদান প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি ইত্যাদি।প্রতিটি মানুষ যদি সচেতনভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও কর্মস্থলে নিজস্ব স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলে তাহলে করোনাভাইরাসকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।অতিমারি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ভীতি নয় সচেতনতা, আতঙ্ক নয় সাবধানতা এই মূলমন্ত্র জনারণ্যে ছড়িয়ে দিয়ে সম্মিলিত ও যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে সকলকে উদ্ভুদ্ধকরণের মাধ্যমে সহজেই সফলতা অর্জণ করা সম্ভব।যেহেতু কোভিড-১৯ এর কোনো ঔষধ, ভ্যাকসিন বা টিকা এখনও আসেনি এবং কখন আসবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না আবার আসলেও সকলের জন্য সুলভ ও সহজলভ্য হবে কিনা তাও নিশ্চিত নয় সেজন্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্ববাসির সম্পূর্ণ মনোযোগ যখন করোনার দিকে নিবদ্ধ তখনই নতুন করে মাথাচারা দিয়ে উঠছে যক্ষা, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভি এর মতো রোগগুলো।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কোভিড-১৯ বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নড়বরে করে দিয়েছে এবং এককভাবে করোনাভাইরাসের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার ফলে যক্ষা, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভিসহ অন্যান্য ভয়ংকর রোগ প্রতিরোধের প্রতি অবহেলা সৃষ্টি হয়েছে এতে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও খারাপের দিকে ধাবিত হতে পারে।নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে করোনার বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে যে লকডাউন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে যক্ষা, ম্যালেরিয়া, এইচআইভির মতো রোগের ঔষধ ও রোগ নির্নয়ের যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এতে করে এসমস্ত রোগের সংক্রমন ও মৃত্যুর হার করোনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিন আমিরিকায় এসব রোগ শনাক্ত ও ঔষধ প্রাপ্তিতে বড় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, তাছাড়া করোনাভাইরাসের ভয়ে এসব রোগের অনেক ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগী সেবাবঞ্চিত হচ্ছে।লকডাউনে আকাশ ও নৌপথে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ায় ঔষধ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে ফলে এসব রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে।এমনিতেই প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ১৫ লাখ মানুষ শুধু যক্ষায় মারা যায়, ম্যালেরিয়ায় মারা যায় ১৪ লাখ মানুষ আর এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৫ লাখ মানুষ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে করোনাভাইরাসের চলমান পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে যক্ষা, ম্যালেরিয়া সৃষ্ট সংকট বিশ্বব্যাপী নতুন মহামারি আকারে আবির্ভূত হবে। অতএব এসকল রোগের সংস্পর্শ ও সংক্রমন থেকে দূরে থাকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।শুধু করোনা কিংবা যক্ষা ম্যালিরিয়া নয়, যেকোনো প্রকারের সংক্রামক ব্যাধি, রোগবালাই কিংবা অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে থাকতে কিংবা পরিত্রাণ পেতে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন হতে পারে প্রধান রক্ষা কবচ।কোভিড-১৯ মানুষকে কিছু ভালো গুণাবলী অর্জন এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা চর্চার সুযোগ করে দিয়েছে যেমন ব্যক্তিগত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা, শুচিতা, শুদ্ধতা, নৈতিকতা, উদারতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক সচেতনতা, ঐক্যবদ্ধতা, যৌথতা, যুথবদ্ধতা, পরপোকারিতা, সংবেদনশীলতা, মননশীলতা, দানশীলতা ইত্যাদি বহু অপার্থিব মানবিয় গুণাবলী চর্চা ও অনুশীলনের দ্বার খুলে দিয়েছে।সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের দায়বদ্ধতা নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং সমাজের অপরাপর মানুষের প্রতি এটিই এখন করোনাকালে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি একজন দায়বদ্ধ মানুষই পারে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অনুশীলন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করতে।আর এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ এগিয়ে এলেই যে কোনো মারি, মহামারি কিংবা অতিমারি প্রতিরোধ করা সম্ভব।স্বাস্থ্যবিধি ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা একে অপরের পরিপূরক কেননা স্বাস্থ্যবিধি হলো রোগ সৃষ্টিকারি জীবানু বা ভাইরাসের বিস্তার রোধ করার অনুশীলন আর পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা হলো সংক্রমন সৃষ্টিকারী জীবানুকে প্রতিহত করার জন্য জীবানুর বাহক বা সহায়ক উৎস যেমন ময়লা আবর্জনা দূর করা।
কোভিড-১৯ সম্পর্কে এতদিন পর্যন্ত যা জানা গেলো এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়া গেলো তার মুদ্দা কথা হলো আগমী দিনগুলোতে আমাদের হয়তো করোনার সাথেই বসবাস করতে হবে।হয়তো করোনা আর কখনই যাবেনা।কলেরা, ডাইরিয়া, ম্যালেরিয়া, যক্ষা, গুটিবসন্তের জন্য দায়ী ভাইরাসের মতো কোভিড-১৯ এর জন্য দায়ী সার্স-কোভ-২ ভাইরাসও পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে।টিকা কখন আসবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, আর টিকা আসলেও হওতো স্থায়ীভাবে এ ভাইরাস নির্মূল হবে না। অতএব আগামীর পৃথিবীতে করোনার সাথে বসবাসের কৌশল আমাদের রপ্ত করতে হবে।করোনা আক্রান্ত পৃথিবীতে বসবারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি অনুরসণই হলো এখনও পর্যন্ত কার্যকর কৌশল।সর্বস্তরে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের মাধ্যমে ব্যক্তি, আবাসস্থল, কর্মস্থল ও আশেপাশের সকলকে ঝুকিমুক্ত রাখা সম্ভব।যেমন বাড়িতে সকলকে হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে।বার বার সাবান পানি দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে।বাইরে গেলে অবশ্যই মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।জনসমাগম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।বাড়ির বাইরে কোনো খাবার (Street Food), ফার্স্ট ফুট (First Food),প্যাকেজ ফুড(Package Food), ভারি খাবার(Heavy Food), প্রক্রিয়াজাত খাবার (Process Food), অধিক মসলাযুক্ত খাবার (Spicy Food), অধিক তৈলাক্ত খাবার(greasy Food) সফ্ট ডিংকস, হার্ড ডিংকস খাওয়া যাবেনা।অপ্রয়োজনে কোনো কিছু টাচ করা যাবে না, রাস্তায় কারো সাথে হাত মেলানো যাবে না, মুখে, নাকে ও চোখে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাবেনা, যেখানে সেখানে কফ ও থুথু ফেলা যাবেনা, নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতে হবে, অযথা অড্ডা দেওয়া বা বাড়ির বাইরে অবস্থান করা যাবেনা, দীর্ঘ জার্নি হলে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি সাথে রাখতে হবে, সেনিটাইজার সাথে রাখতে হবে এবং কিছুক্ষণ পরপর হাত জীবানু মুক্ত করতে হবে, ধুমপান পরিত্যাগ করতে হবে, বাইরে থেকে ঘরে এসেই সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করতে হবে এবং জামা কাপড় ধুয়ে দিতে হবে।স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের ঘর-দোয়ার ও আবাসস্থলও জীবানু মুক্ত রাখতে হবে, বাড়ির আশপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।রোগ সংক্রমনে প্রধান উৎস যেমন মানুষ, খাদ্য, পানি এবং গৃহপালিত পশু এবং বাড়ির চারপাশে যেখানে পানি জমে থাকে যেমন ডোবা, পায়খানা, প্লাস্টিকের বোতল, ফেলে দেওয়া ভাঙা্ তৈজসপত্র, ফুলের টব, নারকেলের খোসা, ইত্যাদি খুব সহজেই জীবানু বংশ বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয় এবং হাতের স্পর্শ, খাবার বা বায়ু বাহিত হয়ে জীবানু দেহে ঢুকে যায় ফলে এগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।বাড়ির আশে পাশে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা জমতে না দেওয়া এবং এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।বাড়িতে প্রতিবার খাবার রান্না বা প্রস্তুতের আগে ও পরে এবং খাওয়ার আগে ও পরে, বাথরুম ব্যবহারের আগে ও পরে এবং বাইরে থেকে ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ভালো করে সাবান পানি দিয়ে হাত দৌত করতে হবে। বাজার থেকে শাকসব্জি ও ফলমূল কিনে নিয়ে প্রথমেই কলের চলন্ত পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।বাড়ির ভিতরে যেখানে বেশি হাতের স্পর্শ লাগে, খাবার যেখানে প্রস্তুত হয় এবং রাখা হয়, যা দিয়ে খাবার ধরা হয়, পরিবেশন করা হয় এবং ধোয়া-মোছার নেকড়া, থালা বাসন ইত্যাদি ভালো করে ধোয়া ও জীবানু মুক্ত রাখতে হবে।এছাড়া দরজার হাতল, নব, তালা, টেলিফোন, মোবাইল, রিমুট, বিদ্যুতের সুইচ, জুতা রাখার জায়গা, বেসিন, পানির কল, কমড বা পেন, বাথরুমের কলের টেপ, লোটা বা বদনা ইত্যাদি জীবানু নাশক দিয়ে জীবানু মুক্ত রাখাতে হবে। বাড়ির মেঝে, সিড়ি, রান্না ঘর, বারান্দা, খাবার টেবিল, ড্রয়িং রুম, বাথরুম ইত্যাদি পরিস্কারের দুটি ধাপ রয়েছে যেমন প্রথমে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করতে হবে, এবং পরবর্তীতে ডিজইনফেক্টিং বা জীবানুমুক্ত রাখতে হবে। এজন্য প্রথমে পানি দিয়ে ভালো করে ধূয়ে তারপর জীবানুনাশক দিয়ে জীবানু ধ্বংস করতে হবে।বাড়ির প্রতিটি ঘরে, টেবিলে, কিচেনে টিস্যু বা কিচেন রোল রাখতে হবে যাতে করে হাঁচি বা কাশির সময় হাত বাড়ালেই টিস্যু পাওয়া যায়।ব্যবহৃত টিস্যু বা ময়লা ফেলার পাত্র বা বিন ডাকনাযুক্ত হতে হবে যাতে করে জীবানু ছড়াতে না পারে।ঘরে ব্যবহৃত জিনিস যেমন-দা, বটি, ছুরি, কাটাকুটির জন্য ব্যবহৃত বোর্ড(Chopping bord)ইত্যাদি ভালো করে ধুয়ে রাখতে হবে। সমস্ত খাবার ডেকে রাখতে হবে যাতে ধুলা-ময়লা বা মশা-মাছি বসতে না পারে।বাসি, পঁচা, মেয়াদ উত্তীর্ণ বা দূর্ঘন্ধযুক্ত খাবার এবং ফ্রিজের ডান্ডা পানি পরিহার করতে হবে।বাইরে থেকে আসা কোনো পেকেট, পার্সেল, খাম বা অন্যকিছুতে হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।বাড়িতে রোগী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকলে তাদেরকে আলাদা রাখা ও বিশেষ যত্ম নিতে হবে এবং সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে এবং করোনার চলমান সময়ে বাড়িতে বাইরের মেহমানদের আসা নিরুৎসাহিত করা এবং নিজেরাও কোথায় বেড়াতে না যাওয়া।ব্যবহার্য ব্যক্তিগত কাপড়-চোপর, হাত ঘড়ি, চশমা, জুতা, সাইকেল, মটর সাইকেল, কার ইত্যাদি জীবানু মুক্ত রাখতে হবে।আবার অফিস বা কর্মস্থলে অফিস কক্ষ, নিজের টেবিল বা ডেস্ক, কম্পিউটার, চেয়ার, ব্যবহৃত তোয়ালে ইত্যাদি জীবানু মুক্ত রাখা, বাড়ির তৈরি খাবার, নাস্তা ও পানির বোতল সঙ্গে রাখা, অফিসে সহকর্মীদের সাথে এবং সেবা গ্রহিতাদের সাথে স্বাভাবিক দুরত্ব বজায় রাখাসহ প্রতিটি মুহুর্তে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।অফিসের কমন বাথরুম, কমন টয়লেট, বেসিন ইত্যাদি ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে।অপ্রয়োজনে নিজের কক্ষ ও ডেস্ক ছেড়ে অন্য কক্ষ বা ডেস্কে গিয়ে আড্ডা না দেওয়া এবং অফিসে এসি থাকলে যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করা বা পরিহার করা, এবং লিফ্ট পরিহার করে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে।অফিসের মিটিং এ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখঅ সম্ভব হলে অনলাইনে মিটিং সমাধা করাসহ ইত্যাদি বিষয়ে অবশ্যই সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রতিপালন করতে হবে।কোভিড-১৯ সম্পর্কে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই একে মোকাবিলা সম্ভব।
স্বাস্থ্যবিধি মানা ও নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা সকলকে অবশ্যই অভ্যাসে পরিনত করেতে হবে এবং দৈনন্দিন রুটিন কাজ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জীবানু থেকে বাঁচতে হলে এবং করোনাকে প্রতিহত ও মোকাবিলা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জারি করা স্বাস্থ্যবিধি, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা স্বাস্থ্যবিধি এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জারি করা ৩১ দফা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের জানা থাকা উচিত এবং আমাদের নিজেদের ও পরিবারের স্বার্থে যথাযথভাবে এগুলো মেনে চলা উচিত।স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রত্যেক সচেতন ও বিবেকবান মানুষের উচিত নিজেদের পরিবার ও পরিজন এবং আশেপাশের মানুষকে অবহিত করা এবং সচেতন করা।স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও প্রতিপালনে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহনের মাধ্যমেই অতিমারি কোভিড-১৯ সহ সকল সংক্রামক রোগ-বালাই ও অসুখ-বিসুখ থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রক নিরাপদ রাখা সম্ভব।অতএব স্বাস্থ্যবিধি হয়ে উঠুক আমাদের প্রত্যেকের দৈনন্দিন চর্চা, প্রতিপালন ও অনুশীলনের বিষয় এবং এটিই হোক কোভিড-১৯ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

Check Also

“উৎসবপ্রিয় বাঙ্গালীর সার্বজনীন শারদীয় দূর্গাপূজা” – উত্তম কুমার পাল হিমেল

শারদীয় দূর্গোৎসব হল উৎসবপ্রিয় বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ গুরুত্বপূর্ন ও ধর্মীয় সামাজিক উৎসব। প্রতিবছর শরতকাল …