Home / সারাদেশ / চট্টগ্রাম / চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারন দুর্বল ড্রেন ও খালনালা দখল

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারন দুর্বল ড্রেন ও খালনালা দখল

অনলাইন ডেস্ক: চট্টগ্রাম নগরীতে দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অবৈধ দখলদারদের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এ দু’সমস্যা নিরসন করা গেলেই নগরবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন বলে মনে করছেন চসিক কর্মকর্তারা। বর্ষা শুরু হলেই নগরবাসীর বুকে কাঁপন ধরে। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমড় পানি জমে রাস্তা-ঘাট এবং বাসাবাড়ি ডুবে যায়। এছাড়া নগরীর নিুাঞ্চলগুলো প্রায় সময় জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকে। ওই সব এলাকায় জোয়ারের পানির সঙ্গে বৃষ্টির পানি যোগ হলে বন্যা দেখা দেয়। যার কারণে নগরীর নিচু এলাকার বাসিন্দাদের বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নগরীর পুরনো সমস্যা জলাবদ্ধতা নতুন মেয়রকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তার নির্বাচনী ইশতেহারে জলাবদ্ধতা নিরসনই ছিল প্রধান অঙ্গীকার। তাই তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগেই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেন কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগকে। পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রধান শফিকুল মান্নান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি টিম নগরীর জলাবদ্ধতায় প্রধান দু’কারণ চিহ্নিত করে ইতিমধ্যে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। এ রিপোর্টে জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করা হয়েছে নগরীর দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অবৈধভাবে খাল ও নালা দখল। প্রভাবশালী মহল কর্তৃক গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ওপর জোর দেয়া হয় এ রিপোর্টে। এছাড়া এর আগে সিটি কর্পোরেশনে পৃথক এক রিপোর্টে ১৯৯৫ সালে প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে গত দুই দশকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তারপরও মুক্তি মিলছে না জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বরাদ্দ করা সিংহভাগ টাকা অপরিকল্পিতভাবে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। অপরদিকে নগরীর পুকুর-ডোবা এবং নদী-খালের পাশ ঘেঁষে ভবনের নকশার অনুমোদন দিচ্ছে সিডিএ’এর এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। অর্থের বিনিময়ে এভাবে অবৈধ নকশা অনুমোদন নিয়ে প্রভাবশালীরা নগরীর পানি নিষ্কাশনের আধার খালনালা জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। যে কারণে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়রকে দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অবৈধ দখলদারদের কারণেই চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। চিহ্নিত এ দু’সমস্যা সমাধান করা গেলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন চসিক কর্মকর্তারা। এছাড়া ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খাল ও নালা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, কোনো কোনো স্থানে খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, কোথাও সরু নালার কারণে পানি নিষ্কাশন না হওয়া, ডাস্টবিনের পরিবর্তে নালা-নর্দমায় ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে অনুসন্ধান চালিয়ে জলাবদ্ধতার এসব কারণ চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগ।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের কোথায় কী কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে তা নবনির্বাচিত মেয়রের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে অবৈধ দখল উচ্ছেদপূর্বক খাল ও নালা উদ্ধার করে খনন ও সংস্কার করাসহ বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে মেয়রকে দেয়া প্রতিবেদনে। সূত্র জানিয়েছে, মেয়র দায়িত্ব নেয়ার পর এই প্রতিবেদন দেখে জলাবদ্ধতা নিরসনে সুপারিশমালা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।

জলাবদ্ধতা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতার তিনটি কারণকে দায়ী করা হয়। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নালা ও খাল বেদখল এবং নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার রোধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয় অতিবৃষ্টিতে কর্ণফুলী নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি চাক্তাই খাল, ডোম খাল, হিজড়া খাল, মির্জা খাল, শীতল ঝর্ণা খাল, বামুননয়া হাট খাল, গুলজার খাল, বীর্জা খাল, ইছান্যা খাল, মাইট্টা খাল, লালদিয়ারচর খাল, ত্রিপুরা খাল, নাছির খাল, গয়না ছড়া খাল, কাট্টলী খাল, চশমা খালসহ নগরীর ওপর অবস্থিত ১৭টি খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন এসব খাল এক শ্রেণীর খালখেকোর কবলে পড়ে এখন নালায় পরিণত হয়েছে। যার কারণে খালে স্বাভাবিক পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। নগরীর ১৭টি খালের আশপাশে বসবাসকারী লোকজন খাল ভরাট করে ভবন এবং দোকানপাট নির্মাণের পাশাপাশি খালগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে ময়লা-আর্বজনা ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে। ফলে খালগুলো দিন দিন ভরাট হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া দ্রুত নগরায়নের ফলে নগরীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান জলাশয়, ডোবা, নালা, পুকুর ভরাট করে ফেলায় নগরীর রাস্তা ও নালা একাকার হয়ে গেছে। এতে বৃষ্টির পানি রাস্তা দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

১৯৯৫ সালে প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন কয়েকজন নগর পরিকল্পনাবিধ। তাদের মতে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এদিকে সিডিএর এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে যত্রতত্র বহুতল ভবনের নকশার অনুমোদন দিচ্ছে। পুকুর-ডোবার ওপর এবং নদী-খালের ওপর অপরিকল্পিতভাবে এসব ভবন নির্মাণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। চয়েটের বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীর ৯৫ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে সিডিএর নকশাবহির্ভূতভাবে। তবে ওইসব ভবন গড়ে ওঠার সময়ে বাধা দেয়নি সিডিএ।

সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনসহ কর্পোরেশনের উন্নয়ন কাজে সরকারের কাছে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় জলাবদ্ধতা নিয়ে তার গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ছোটবড় অনেকগুলো খালের মাটি উত্তোলন করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

টানা বৃষ্টিতে স্থবির চট্টগ্রামের জনজীবন : মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সারাদিন ছিল অবিরাম বৃষ্টি। টানা বর্ষণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নগরবাসী। তলিয়ে গেছে নগরীর অধিকাংশ নিুাঞ্চল। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জোয়ারের পানির সঙ্গে টানা বর্ষণ দুর্ভোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শুক্রবার ছুটির দিনে টানা বর্ষণে নগরীর রাস্তাঘাট ছিল প্রায় ফাঁকা। জীবনযাত্রা ছিল স্থবির।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২২৪ মিলিমিটার। এ অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নগরীর অক্সিজেন, হামজারবাগ, মুরাদপুর, আতুরার ডিপো, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, কাতালগঞ্জ, নাসিরাবাদ, বায়োজিদ, ষোলশহর, চকবাজার, পাঁচলাইশ, ডিসি রোড, খাজা রোড, চান্দগাঁও, মোহরা, বাকলিয়া, চাক্তাই, কোরবানিগঞ্জ, মাস্টারপুল, বৌ বাজার, মিয়াখাননগর, রাজাখালী, দেওয়ানবাজার, আগ্রাবাদ, ছোটপুল, বড়পুল, সিডিএ, হালিশহর, পাহাড়তলী, সরাইপাড়া, সাগরিকা, কাঁচারাস্তার মাথা ও পতেঙ্গার নিুাঞ্চল তলিয়ে গেছে। পানি ঢুকে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি অফিসেও। এসব অফিস বন্ধ থাকায় পানি সরানোর উদ্যোগ নিতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। কোথাও বাসা-বাড়িতেও কোমর সমান পানি। সড়কে যান চলাচলও তেমন দেখা যায়নি। ঘর থেকেও বের হতে পারছে না মানুষ। বৃষ্টির পানির সঙ্গে জোয়ারের পানি যোগ হওয়াতে কর্ণফুলী নদী ও খালগুলোর আশপাশে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। জোয়ারের কারণে যথারীতি নগরীর আগ্রাবাদ, ছোটপুল, বড়পুল ও সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ মাত্রা ছাড়িয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ুর অক্ষ রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটির বর্ধিতাংশ উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে এবং এর প্রভার উত্তর বঙ্গোপসাগরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছড়িয়েছে। আরও দু’একদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া দফতরের কর্মকর্তা শাহীনুর রহমান।

আবহাওয়া অধিদফতর সূত্র জানায়, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ অঞ্চলে অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।

Check Also

ঈদের জামাতে ডিএমপির ১৪ নির্দেশনা

অনলাইন ডেস্ক -প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে ঈদগাহ বা উন্মুক্ত স্থানে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজের জামাত …

Leave a Reply