Home / সাহিত্য / কাজী নজরুল আমাদের কবি

কাজী নজরুল আমাদের কবি

সফিউল্লাহ আনসারী

নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। নজরুল আমাদের আদর্শ ও জাতীয় চেতনার কবি। যার ক্ষুরধার লেখনীতে জাগরণ আসে। প্রেমের অমর সুধায় আপ্লুত হওয়া যায়। ধর্মীয় বিভেদ ভুলে অসাম্প্রদায়িক হওয়া যায় যার লেখায়, তিনি কবি নজরুল।
আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক ও দারিদ্র্য জয় করে চরম সাহসিকতাকে বোধের চূড়ায় স্থাপিত করার নায়ক কবি নজরুল ইসলাম। নজরুল আদর্শকে ধারণ করে আমরা বাঙালি ও বাংলাদেশিরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের মাঝে অনন্য জাতি হিসেবে পরিচিত হতে পারি।
বিদ্রোহ, প্রেম, বিরহ, ইসলামি চেতনা ও সাম্যবাদী কবি নজরুল ইসলাম, যার পরিচয় তার লেখাতেই স্পষ্ট: বল বীর, বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির …
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত…
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু কবি বা লেখক নামে সীমাবদ্ধতায় আটকে রাখা যায় না। অভিনেতা (উইকিপিডিয়া), সাংবাদিক, গায়ক-নায়ক, দার্শনিক ও রাজনীতিক যে দিক থেকেই দেখি না কেন, সেখানেই তার স্বপ্রতিভ উপস্থিতি ও বলিষ্ঠ অবস্থান দেখতে পাই। এপার-ওপার বাংলায় তার কবিতা ও গান সবার কাছেই সমানভাবে সমাদৃত।
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে তার অপ্রতিরোধ্য এবং দুঃসাহসী রচনা ও অবস্থান তাকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তার রচিত অনন্য-অসামান্য রচনা বিদ্রোহী (১৯২২) কবিতা, যা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথে উজ্জীবিত করেছে। মানুষ জেগেছে নতুন করে তার এই কবিতার শক্তিতে। অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তিনি জেল-জুলুম সহ্য করেছেন; কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি কখনও।
নজরুলের রচনায় বাংলা ছাড়াও আরবি, ফারসি, হিন্দি, ইংরেজিসহ একাধিক ভাষার ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। একাডেমিক শিক্ষায় সনদ না থাকলেও তার রচনা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেবাস আকারে পড়ানো হয়। এটা কতটা বড় মাপের ও গর্বেরÑতা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবি নজরুল ইসলাম প্রায় তিন হাজার জনপ্রিয় গান রচনা ও সুর করেছেন, যেগুলো ‘নজরুল সংগীত/নজরুল গীতি’ নামে আমাদের মাঝে পরিচিত।
এই মহান কলমসৈনিক ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। ছাত্রজীবনে নজরুলের প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল; এরপর ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীকালে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে।
১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। ১৯২০-এর দশকে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন একসময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরপর স্বরাজ গঠনে যে সশস্ত্র বিপ্লববাদের আবির্ভাব ঘটে, তাতে ধূমকেতু পত্রিকার বিশেষ অবদান ছিল। কাজী নজরুল ইসলামের প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭), একুশে পদক (১৯৭৬), পদ্মভূষণ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন, ‘মসজিদেরই কাছে আমায় কবর দিয়ো ভাই/যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’Ñকবির এমন ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তার সমাধি রচিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার রচিত অসংখ্য গ্রন্থ আমাদের সম্পদ। অসাম্প্রদায়িক এই কবি ইসলামি সংগীত রচনার পাশাপাশি অনেক শ্যামাসংগীতও রচনা করেন। তার সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট; মানবতাবাদ ছিল প্রবল।
‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অ-কবি যাহা বলো মোরে মুখ বুজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী! (আমার কৈফিয়ৎ)
কিংবা, শ্যামাসংগীত
‘মার হাতে কালি মুখে কালি,
মা আমার কালিমাখা, মুখ দেখে মা পাড়ার লোকে হাসে খালি।
মোর লেখাপড়া হ’ল না মা, আমি ‘ম’ দেখিতেই দেখি শ্যামা,
আমি ‘ক’ দেখতেই কালী ব’লে নাচি দিয়ে করতালি।’
নজরুল আমাদের চেতনায়, আর নজরুলের চেতনায় আমাদের অসাম্প্রদায়িক স্বপ্নের এই দেশ। নজরুলের অহিংস চেতনাকে লালন আর ধারণ করে এবং প্রত্যেক কর্মে বাস্তবায়ন করে আমরা কবিকে শ্রদ্ধা করি। কবি নজরুল গরিবের কবি, মানুষের কবি, বড়দের কবি, ছোটদের কবি, নির্যাতিতদের, সত্য-ন্যায়ের কবি, সর্বোপরি গণমানুষের কবি। নজরুল ছোট-বড় সবার জন্যই লিখেছেন।
ছোটদের জন্য কবির জনপ্রিয় লেখা
থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে
দেখবো এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

পাতাল ফেড়ে নামব আমি
উঠব আমি আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্বটাকে দেখব আমি
আপন হাতের মুঠোয় পুরে’র মতো নজরুলের অসংখ্য লেখা শিশুসাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
বাংলা-বাঙালির মননে, চিন্তা-চেতনায় কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব ছিল, আছে এবং থাকবে অনন্তকাল। তার অসামান্য রচনা আর সবকিছু ছাপিয়ে কবি হয়ে ওঠেন-শাণিত চেতনায় জনমানুষের কবি, আমাদের কবি।
কবি তার লেখায় বিভেদহীনভাবে নারীকে তার সম্মানে আসীন করেছেন
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
কবির এমন অসংখ্য কবিতা আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেছে। নজরুলের লেখাগুলো জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল আবেগের গভীরতা আর দুঃসাহসী উচ্চারণ।
সাহিত্যচর্চার জন্য খুবই সামান্য সময় পেয়েছিলেন কবি নজরুল। অথচ জীবনের এই সামান্যতম সময়েই তিনি বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তার অসংখ্য লেখনীতে। নজরুল আমাদের বাঙালি জাতির চেতনার কবি। তার লেখনীতে আমরা অনুপ্রাণিত হই।
তার কবিতার ? দুটি লাইন দিয়ে শেষ করতে চাই ‘নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’/ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে’। কবিও আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসা আর অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসায় আছেন মিশে। চতুর্মুখী প্রতিভাধর জাতীয় কবি, আমাদের কবি, বিদ্রোহী কবির জন্ম দিনে তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

গণমাধ্যমকর্মী
shofiullahansari@gmail.com

Check Also

কবিতা

খুঁজি তোমায়_সফিউল্লাহ আনসারী তোমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখা খুঁজি মনের মিল, দু’চোখ জুড়ে কত্তো স্বপন আনন্দ …